🌹উচ্চমাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নোত্তর::4th Semester::অধ্যায়-৫::স্বাধীনতার পথে।।🌹


 

️প্রশ্নের মান-৩/৪:

📝 ১. ওয়াভেল পরিকল্পনা কী? এর পটভূমি আলোচনা করো।


উত্তর:
ওয়াভেল পরিকল্পনা ছিল ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক অচলাবস্থা দূর করে কেন্দ্রীয় সরকারে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বাড়ানোর একটি প্রস্তাব। ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল এ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।


🔹 ১. ওয়াভেল পরিকল্পনার মূল ধারণা (Main Idea of the Plan):
১. কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে সব সদস্য ভারতীয় হবে—শুধু ভাইসরয় বাদে।
২. হিন্দু–মুসলমানের ভারসাম্য রক্ষায় সমসংখ্যক সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়।


🔹 ২. পরিকল্পনার উদ্দেশ্য (Objectives):
১. ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বাড়তে থাকা অসন্তোষ কমানো।
২. স্বাধীনতা আন্দোলনের চাপ মোকাবিলা করে ভারতীয়দের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো।


🔹 ৩. পটভূমি ও পরিস্থিতি (Background & Circumstances):
১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতার দাবি তীব্র হয়।
২. কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মতবিরোধে প্রশাসন অচল হয়ে পড়েছিল—এই পরিস্থিতিতেই ব্রিটিশরা সমাধানের পথে এগোয়।


🔹 ৪. প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল (Response & Outcome):
১. কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ উভয়ই আসন্ন ভিন্ন স্বার্থের কারণে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি মেনে নেয়নি।
২. পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী সময়ে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার পথ উন্মুক্ত হয়।


শেষমেশ বলা যায়, ওয়াভেল পরিকল্পনা ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংবিধানিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ব্যর্থ উদ্যোগ।

📝 ২. রাজাজি সূত্র বা সি. আর. ফর্মুলা বলতে কী বোঝো?


উত্তর:
রাজাজি সূত্র বা সি. আর. ফর্মুলা ছিল ১৯৪৪ সালে সি. রাজগোপালাচারী প্রস্তাবিত একটি সমঝোতা ফর্মুলা, যার উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করা এবং স্বাধীনতার পর ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা।


🔹 ১. পরিচয় ও প্রস্তাবক (Identity & Proposer):
১. এই ফর্মুলা প্রস্তাব করেন কংগ্রেস নেতা সি. রাজগোপালাচারী (রাজাজি)।
২. ব্রিটিশ ভারতভাগ প্রশ্নে স্থবিরতা দূর করাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।


🔹 ২. মূল প্রস্তাব (Key Proposals):
১. সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২. ব্রিটিশ প্রত্যাহারের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে শান্তিপূর্ণ রূপান্তর নিশ্চিত করা হবে।


🔹 ৩. উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন (Purpose & Necessity):
১. কংগ্রেস–মুসলিম লিগের বিরোধ কমিয়ে স্বাধীনতার পথ মসৃণ করা।
২. পাকিস্তান দাবির প্রশ্নে একটি গণভিত্তিক সমাধান সৃষ্টি করা।


🔹 ৪. প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি (Response & Outcome):
১. কংগ্রেসের অনেক নেতাই পাকিস্তানের সম্ভাবনা স্বীকারে অনিচ্ছুক ছিলেন, তাই তাঁরা আপত্তি জানান।
২. জিন্নাহ ফর্মুলাকে পুরোপুরি গ্রহণ না করায় উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়, তবে এটি পরবর্তী যুগোপযোগী আলোচনার ভিত্তি স্থাপন করে।


শেষমেশ বলা যায়, রাজাজি সূত্র ছিল ভারত ভাগ ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার এক সাহসী কিন্তু ব্যর্থ প্রচেষ্টা।


📝 ৩. টীকা লেখো: রশিদ আলি দিবস


উত্তর:
রশিদ আলি দিবস ১৯৪৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পালিত এক গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দিন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাপ্টেন রশিদ আলির বিচার ও তাঁর মুক্তির দাবিতে এই দিবস উদযাপিত হয় এবং এটি ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনাকে শক্তিশালী করে।


🔹 ১. সংক্ষিপ্ত পরিচয় (Short Introduction):
১. আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্য ক্যাপ্টেন রশিদ আলির ওপর ব্রিটিশ সরকার বিচার শুরু করলে ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
২. মুসলিম ছাত্র লীগ ধর্মঘটের ডাক দেয়, যা ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হয়।


🔹 ২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (Historical Background):
১. ১৯৪৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় রশিদ আলির মুক্তির দাবিতে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়।
২. এই ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালিত হয়, যা ‘রশিদ আলি দিবস’ নামে পরিচিত হয়।


🔹 ৩. দিবস পালনের কারণ (Cause of Observance):
১. আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাপ্টেন রশিদ আলির মুক্তির দাবি জানানো ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
২. তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ব্রিটিশ বিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আসে।


🔹 ৪. তাৎপর্য ও প্রভাব (Significance & Impact):
১. রশিদ আলি দিবস ব্রিটিশবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন ধারা সৃষ্টি করে।
২. এটি স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জনঅবস্থানকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।


শেষমেশ বলা যায়, ‘রশিদ আলি দিবস’ ছিল ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ, রশিদ আলির মুক্তির দাবি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্রদের ঐতিহাসিক ভূমিকার এক প্রতীকী স্মৃতিচিহ্ন।


📝 ৪. মাতঙ্গিনী হাজরা ইতিহাসে স্মরণীয় কেন?


উত্তর:
মাতঙ্গিনী হাজরা ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের এক নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি ১৯৪২ সালে তমলুক থানা দখলের মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তাঁর বয়স, ত্যাগ ও অটল সাহস তাঁকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।


🔹 ১. পরিচয় ও উপাধি (Identity & Title):
১. তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং এ কারণে ‘গান্ধী বুড়ি’ নামে পরিচিত হন।
২. তাঁর নিষ্ঠা, আত্মনিবেদন ও অহিংস আদর্শ তাঁকে জনমানসে বিশেষ স্থান দেয়।


🔹 ২. তমলুক থানা দখল অভিযান (Tamluk Police Station March):
১. ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, ৭৩ বছর বয়সে তিনি তমলুক থানা দখলের মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
২. এই অভিযান ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ গণপ্রতিরোধের অংশ।


🔹 ৩. শহিদত্ব (Martyrdom):
১. ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল এগোতে থাকলে ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালায়।
২. বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েও তিনি ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে শহীদ হন।


🔹 ৪. সাহস ও উত্তরাধিকার (Courage & Legacy):
১. বয়স, কষ্ট বা বিপদের পরোয়া না করে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করেন।
২. নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তাঁর নাম এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।


শেষমেশ বলা যায়, মাতঙ্গিনী হাজরা তাঁর অদম্য সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের জন্য ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।


📝 ৫. ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার কারণগুলি ব্যাখ্যা করো


উত্তর:
১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন ভারতকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা না দিয়ে কেবল ডোমিনিয়ন মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করে, যা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়। ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতার অভাব, অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা ও অস্পষ্ট প্রস্তাব এই মিশনকে ব্যর্থ করে। এ ব্যর্থতা ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর পথ প্রশস্ত করে।


🔹 ১. আপস ও অস্পষ্ট প্রস্তাব (Compromise & Ambiguity):
১. পূর্ণ স্বাধীনতার বদলে ‘ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস’ দেওয়ার কথা বলা হয়, যা কংগ্রেস মানতে পারেনি।
২. যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে ক্ষমতা হস্তান্তর বা শাসনকার্য কেমন চলবে—তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশ ছিল না।


🔹 ২. রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ (Differences Among Indian Parties):
১. কংগ্রেস সম্পূর্ণ স্বাধীনতা (পূর্ণ স্বরাজ) ছাড়া কিছুই মেনে নিতে রাজি ছিল না।
২. মুসলিম লীগ পাকিস্তান গঠনের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
৩. হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য সংগঠনও নানা দিক থেকে আপত্তি তোলে।


🔹 ৩. ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতার অভাব (Lack of British Sincerity):
১. চার্চিল ও ভাইসরয় লিনলিথগো মিশনের সফলতায় আগ্রহী ছিলেন না এবং ক্রিপসকে সমর্থনও দেননি।
২. ভারতীয় নেতাদের মধ্যে ব্রিটিশদের ওপর আস্থা তৈরির মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।


🔹 ৪. গান্ধীর ‘পোস্ট-ডেটেড চেক’ মন্তব্য (Gandhi’s Famous Remark):
১. গান্ধী ক্রিপস মিশনের প্রস্তাবকে বলেন—“ভেঙে পড়া ব্যাঙ্কে টানা একটি পোস্ট-ডেটেড চেক।”
২. এটি ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতির উপর তাঁর গভীর অনাস্থার প্রতিফলন।


শেষমেশ বলা যায়, অস্পষ্ট প্রস্তাব, পূর্ণ স্বাধীনতা না দেওয়া, পাকিস্তান প্রশ্নে অনিশ্চয়তা, এবং ব্রিটিশ সরকারের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা—এই সব কারণেই ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধকালীন ভারতবর্ষে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

📝 ৬. ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের গুরুত্ব কী ছিল?


উত্তর:
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ছিল ব্রিটিশ ভারতের সর্ববৃহৎ সাংবিধানিক আইন, যার মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রতিষ্ঠার মতো মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। যদিও এতে ব্রিটিশ শাসনের আধিপত্য বজায় ছিল, তবুও আইনটি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।


🔹 ১. প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা (Provincial Autonomy):
১. আইন প্রথমবারের মতো প্রদেশগুলোকে পূর্ণ দায়িত্বশীল সরকার গঠনের সুযোগ দেয়।
২. মন্ত্রীরা নির্বাচিত আইনসভা-দ্বারা পরিচালিত হন—এটি ভারতীয়দের প্রশাসনে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে।
৩. গভর্নরের ক্ষমতা বজায় থাকলেও বাস্তবে প্রাদেশিক প্রশাসনে ভারতীয়দের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।


🔹 ২. ফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব (Proposal for All-India Federation):
১. ভারতীয় প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে মিলিয়ে একটি অল-ইন্ডিয়া ফেডারেশন গঠনের কথা বলা হয়।
২. যদিও দেশীয় রাজ্যগুলির অনীহায় এটি কার্যকর হয়নি, তবুও ভবিষ্যতে কেন্দ্র–রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে।


🔹 ৩. কেন্দ্রীয় সরকারের পুনর্গঠন (Reorganization of Central Government):
১. কেন্দ্রীয় আইনসভাকে দ্বিকক্ষ—ফেডারেল অ্যাসেম্বলিকাউন্সিল অব স্টেট—এ বিভক্ত করা হয়।
২. গবর্নর-জেনারেলের হাতে বিশেষ ক্ষমতা থাকলেও আইনসভা চালনার ক্ষেত্রে ভারতীয় সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ে।


🔹 ৪. নির্বাচনী পরিসর বৃদ্ধি (Expansion of Franchise):
১. ভোটাধিকার প্রায় দেড় কোটি থেকে বাড়িয়ে প্রায় তিন কোটিরও বেশি নাগরিককে দেওয়া হয়।
২. এর ফলে ভারতীয় সমাজের বৃহত্তর অংশ রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়।


🔹 ৫. কেন্দ্র–প্রদেশ ক্ষমতা বণ্টন (Distribution of Powers):
১. কেন্দ্র, প্রদেশ ও সমবায় তালিকা—এই তিনভাবে ক্ষমতা ভাগ করা হয়।
২. পরবর্তী ভারতীয় সংবিধানের ক্ষমতা-বণ্টন কাঠামোর ভিত্তি এখান থেকেই আসে।


🔹 ৬. ভারতীয় সংবিধানে প্রভাব (Impact on Future Constitution):
১. ১৯৩৫ সালের আইনের বহু ধারাই পরে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় গ্রহণ করা হয়।
২. বিশেষত কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক, দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা ও নির্বাচনী কাঠামো এ আইন থেকেই অনুপ্রাণিত।


শেষমেশ বলা যায়, ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন অসম্পূর্ণ হলেও তা ভারতীয় স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি রচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

️প্রশ্নের মান-৮

📝 ১. ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের নৌবিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।


উত্তর:
১৯৪৬ সালের রাজগোপাল নৌবিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত এক যুগান্তকারী বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশ শাসনের অন্তিম পর্যায়ে স্বাধীনতা সংগ্রামকে দ্রুততর করেছিল। নৌসেনাদের প্রতি বৈষম্য, খাদ্য–বস্ত্র সংকট ও ঔপনিবেশিক দমননীতির প্রতিবাদে এই বিদ্রোহ শুরু হয় এবং দ্রুত দেশব্যাপী তুমুল সমর্থন লাভ করে।


🔹 ১. নৌবিদ্রোহের মূল কারণ (Causes of the Naval Mutiny):

১. নাবিকদের জন্য নিম্নমানের খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের কারণে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
২. ব্রিটিশ অফিসারদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও বর্ণবাদী মনোভাব বিদ্রোহকে উস্কে দেয়।
৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সামরিক কর্মীদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের উদাসীনতা ক্ষোভ বাড়ায়।
৪. দেশব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব নৌসেনাদেরও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে।
৫. ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)-র দেশভক্তি ও বিচার প্রক্রিয়ার অনৈতিকতা তাদের বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করে।
৬. ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং উপনিবেশিক দমনব্যবস্থা শেষ করার জন্য দেশজুড়ে চাপ তৈরি হয়েছিল।


🔹 ২. বিদ্রোহের বিস্তার (Spread of the Revolt):

১. মুম্বাইয়ের HMIS Talwar জাহাজ থেকে শুরু হয়ে দ্রুত ৭৮টি জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে।
২. প্রায় ২০ হাজার নাবিক বিদ্রোহে যোগ দেন।
৩. ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করা হয়।
৪. বিদ্রোহ মুম্বাই ছাড়িয়ে করাচি, কলকাতা ও চেন্নাইয়েও ছড়িয়ে পড়ে।
৫. নৌসেনাদের পাশাপাশি বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর কিছু অংশও সহানুভূতি জানায়।


🔹 ৩. জনগণের প্রতিক্রিয়া (Public Response):

১. মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই–সহ বৃহৎ শহরগুলিতে সাধারণ মানুষ নৌসেনাদের প্রতি সমর্থন জানায়।
২. বামপন্থী সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘট ও কোলাহল ছড়ায়।
৩. সর্বত্র ব্রিটিশবিরোধী শ্লোগান ও মিছিল সংগঠিত হয়।
৪. পুলিশ–সেনার গুলিতে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন, তবু সমর্থন অব্যাহত ছিল।


🔹 ৪. রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া (Political Reactions):

১. কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ বিদ্রোহকে সমর্থন না করে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়।
২. তবু নৌসেনারা দাবি করে—তারা দেশের স্বাধীনতার জন্যই বিদ্রোহ করেছে।
৩. ব্রিটিশ সরকার দ্রুত দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিন্তু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
৪. এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারের মনে সেনাবাহিনীর আনুগত্য নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করে।


🔹 ৫. নৌবিদ্রোহের গুরুত্ব (Significance of the Naval Mutiny):

১. এটি ব্রিটিশদের কাছে স্পষ্ট করে যে ভারতে আর সশস্ত্র বাহিনীও সম্পূর্ণ অনুগত নয়।
২. স্বাধীনতার প্রশ্নে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়।
৩. বিদ্রোহ চাপ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ সরকারকে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
৪. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এটি ছিল সর্বশেষ বড় সশস্ত্র বিদ্রোহ।
৫. স্বাধীনতার পর ভারতীয় নৌবাহিনীর পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়।


উপসংহার:

১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহ শুধু একটি সামরিক অসন্তোষের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের আগমনী সংকেত। নৌসেনাদের এই বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত গতি দেয় এবং ব্রিটিশ শাসন যে আর টিকবে না—তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

📝 ২.ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্ৰামের বর্ণনা দাও। এই সংগ্ৰাম কী ব্যর্থ হয়েছিল? 


উত্তর:
আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগঠিত একটি সশস্ত্র বাহিনী। ১৯৪২ সালে সাবহারভিনা নেতৃত্বে এবং জাপানের সহায়তায় INA গঠিত হয়। এই বাহিনী ভারতের স্বাধীনতার জন্য সামরিক অভিযান চালায় এবং দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটায়।


🔹 নেতৃত্ব ও গঠন (Leadership & Formation):

  • INA-এর নেতৃত্ব দেন সাবহারভিনা ও এম.জি. রেড্ডি।

  • প্রধানত ব্রিটিশ সেনার প্রিজনার অফ ওয়ার সৈন্যরা এতে যোগ দেয়।

  • বাহিনী জাপানের সমর্থন পায় প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রোপচার জন্য।

  • INA–এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করা।

  • সৈন্যদের মধ্যে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রধান প্রেরণা।


🔹 ভারত অভিযান ও সংগ্রামের বর্ণনা (Indian Campaign & Operations):

  • ১৯৪৪ সালে INA ম্যানিপুর ও ইম্ফাল সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।

  • প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ইম্ফাল ও কাহিপুর অঞ্চল।

  • INA স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে সমর্থন ও সহায়তা পায়।

  • জাপানি সেনাদের সঙ্গে যৌথভাবে সামরিক অভিযান চালায়।

  • কিছু স্থানে সাময়িক সাফল্য অর্জন করলেও দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ সমস্যা ও শক্তিশালী ব্রিটিশ প্রতিরোধের কারণে অভিযান ব্যর্থ হয়।


🔹 ব্যর্থতার কারণ (Reasons for Failure):

  • পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব।

  • জাপানের সামরিক অবনতির কারণে সীমিত সহায়তা।

  • সৈন্যদের অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা।

  • শক্তিশালী ব্রিটিশ প্রতিরোধ ও দ্রুত পদক্ষেপ।

  • কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব।


🔹 সংগ্রামের গুরুত্ব (Significance):

  • INA–এর অভিযান ব্রিটিশ শাসনকে আতঙ্কিত করে।

  • এটি সৈনিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

  • INA–এর সৈন্যদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দেশজুড়ে জাতীয় ঐক্য ও উত্তেজনা তৈরি করে।

  • স্বাধীনতা আন্দোলনে INA–এর সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকে।


উপসংহার:

আজাদ হিন্দ ফৌজের ভারত অভিযান সামরিকভাবে সফল না হলেও, এটি ব্রিটিশ শাসনের স্থায়ীত্ব নাড়া দেয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন গতি ও উৎসাহ যোগ করে। INA–এর সংগ্রাম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে স্থান পায়।

📝 ৩. ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলন (আগস্ট আন্দোলন) সম্পর্কে আলোচনা করো।


উত্তর:
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন (Quit India Movement) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ৮ আগস্ট ১৯৪২-এ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। এটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং স্বদেশী সরকারের দাবি উত্থাপন করে। আন্দোলন ভারতীয় জনগণের সর্বব্যাপী অংশগ্রহণ এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর আবেগের পরিচয় দেয়।


🔹 ১. আন্দোলনের কারণ (Causes of the Movement):

  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা ভারতকে যুদ্ধবিমান ও সৈন্য সরবরাহে ব্যবহার করছিল, ভারতীয়দের মতামত ব্যতীত।

  • ১৯৩৯ সালের প্রাদেশিক সরকার ভেঙে কংগ্রেসের নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হন।

  • ভারতের স্বাধীনতার প্রাপ্তি বিলম্বিত হওয়া এবং ব্রিটিশ শাসনের অব্যাহত দমননীতি।

  • দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়।

  • ‘ভারত ছাড়ো’ স্লোগান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী প্রতিবাদের আহ্বান জানায়।


🔹 ২. নেতৃত্ব ও সংগঠন (Leadership & Organization):

  • মহাত্মা গান্ধী আন্দোলনের প্রধান নেতা এবং নীতি-নির্ধারক।

  • জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু ও সর্দার পদ্মভান সিং সহ কংগ্রেসের অন্যান্য নেতারা বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব প্রদান করেন।

  • আন্দোলন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক স্তরে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়।

  • শান্তিপূর্ণ অসহযোগ নীতি অনুসরণ করা হলেও কিছু স্থানে সহিংসতা সংঘটিত হয়।


🔹 ৩. আন্দোলনের ধরণ ও প্রধান ঘটনা (Nature & Major Events):

  • আন্দোলন মূলত শান্তিপূর্ণ এবং অসহযোগী ছিল।

  • সরকারি অফিস, আদালত, রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করা হয়।

  • কলকাতা, মুম্বাই, লাহোর, ইন্দোরসহ বহু শহরে বিক্ষোভ, মিছিল ও ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়।

  • ব্রিটিশরা আন্দোলন দমন করতে গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ, গুলিচালনা ও সেনা মোতায়েন করে।

  • প্রায় ১,০০,০০০ কংগ্রেস নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বহু সাধারণ মানুষ আহত বা নিহত হয়।


🔹 ৪. আন্দোলনের প্রভাব ও গুরুত্ব (Impact & Significance):

  • ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের গতি ত্বরান্বিত করে।

  • সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি পায়।

  • ভারতের স্বাধীনতার দাবি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরে।

  • কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপেও জনগণের একতা ও উৎসাহ অবনত হয়নি।

  • পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


উপসংহার:

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভারত ছাড়ো আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে এবং ব্রিটিশ শাসনের স্থায়ীত্বকে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি।

<<<<<<<<<<<<<<<<🌹সমাপ্ত🌹>>>>>>>>>>> 

👉For pdf whatsapp-8250978714

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.